ডায়াবেটিস কেন হয়? ডায়াবেটিসের লক্ষণ ও প্রধান কারণ
ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। আমাদের শরীরের জন্য গ্লুকোজ গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। গ্লুকোজকে রক্ত থেকে শরীরের কোষে পৌঁছাতে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে অথবা ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং ডায়াবেটিস হতে পারে।
ডায়াবেটিস কেন হয়?
ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ এর ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে টাইপ-১, টাইপ-২ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস—এই তিন ধরনের ডায়াবেটিস বেশি পরিচিত।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কারণ
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরি করা কোষগুলোকে আক্রমণ ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দেয়।
টাইপ-১ ডায়াবেটিস শুধু বেশি মিষ্টি বা চিনি খাওয়ার কারণে হয় না। জেনেটিক ও পরিবেশগত কিছু কারণ এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণ
টাইপ-২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এই অবস্থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। সময়ের সঙ্গে শরীরের ইনসুলিনের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে এবং অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
- দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- পরিবারের সদস্যদের ডায়াবেটিসের ইতিহাস
- বয়স বৃদ্ধি
- উচ্চ রক্তচাপসহ কিছু বিপাকীয় সমস্যা
- আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ইতিহাস
তবে এসব ঝুঁকি থাকলেই যে একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস হবেই, এমন নয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
গর্ভাবস্থায় কিছু নারীর শরীরে ইনসুলিনের প্রয়োজন বেড়ে যায়। শরীর সেই অতিরিক্ত প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গিয়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ কী?
ডায়াবেটিসের লক্ষণ ব্যক্তি ও রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। আবার বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অনেকের শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
তবে ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি প্রস্রাব হতে পারে।
২. অতিরিক্ত পিপাসা লাগা
ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণে শরীর থেকে বেশি তরল বেরিয়ে যেতে পারে। এর ফলে অতিরিক্ত পিপাসা বা মুখ শুকিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে।
৩. অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা
শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের সমস্যার কারণে রক্তের গ্লুকোজ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারলে বারবার ক্ষুধা লাগতে পারে।
৪. অকারণে ওজন কমে যাওয়া
বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের ঘাটতি হলে শরীর শক্তির জন্য চর্বি ও অন্যান্য উৎস ব্যবহার করতে শুরু করতে পারে। এর ফলে অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমতে পারে।
৫. অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
রক্তে গ্লুকোজ থাকলেও শরীরের কোষগুলো সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে দুর্বলতা, অবসাদ বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
৬. চোখে ঝাপসা দেখা
রক্তে শর্করার মাত্রার পরিবর্তনের কারণে চোখের লেন্সে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দৃষ্টিতে ঝাপসা ভাব দেখা দিতে পারে।
৭. ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
রক্তে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শর্করা থাকলে শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্ষত সারতে বেশি সময় লাগতে পারে।
৮. বারবার সংক্রমণ হওয়া
ডায়াবেটিসে কিছু মানুষের ত্বক, মূত্রনালি বা অন্যান্য স্থানে বারবার সংক্রমণ হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
৯. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, জ্বালাপোড়া বা অবশভাব দেখা দিতে পারে।
কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?
উপরের কয়েকটি লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে শুধু লক্ষণ দেখে ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায় না। ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে
ডায়াবেটিস কেন হয়?—মূলত শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি বা ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ না করার কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস হতে পারে। এর সম্ভাব্য লক্ষণ হলো ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত পিপাসা ও ক্ষুধা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া এবং হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব।

No comments:
Post a Comment